Dhaka , সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬, ১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
ভাষা আন্দোলনে তমদ্দুন মজলিসের মুখপত্র ‘সাপ্তাহিক সৈনিক’ পত্রিকার ভূমিকা -এম আতাউর রহমান পীর আত্মহত্যা নয়, জীবনের পক্ষেই হোক আমাদের অবস্থান কুলাউড়ায় ভাড়াটিয়ার বিরুদ্ধে ঘর না ছাড়ার অভিযোগ, মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ মৌলভীবাজারে কিশোরীকে ধ/র্ষণের অভিযোগে ইউপি সদস্যসহ আটক ২ পূর্বজুড়ী ইউনিয়ন তালামীযের রাতব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত ভাটেরায় তালামীযের উদ্যোগে কৃতি শিক্ষার্থী সংবর্ধনা কুলাউড়ায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেত্রী গ্রেপ্তার কুলাউড়া শহরের যানজট নিরসনে প্রশাসনের উদ্যোগ, নির্ধারিত স্থানে সিএনজি রাখার সিদ্ধান্ত তালামীযে ইসলামিয়া শ্রীপুর জালালীয়া কামিল (এম.এ) মাদ্রাসা শাখা’র আওতাধীন আলিম শাখা’র কাউন্সিল সম্পন্ন: সাইফুর রহমান সভাপতি, সালমান আহমদ সাধারণ সম্পাদক

ভাষা আন্দোলনে তমদ্দুন মজলিসের মুখপত্র ‘সাপ্তাহিক সৈনিক’ পত্রিকার ভূমিকা -এম আতাউর রহমান পীর

  • Reporter Name
  • Update Time : ৩ ঘন্টা আগে
  • ১১ Time View

মহান ভাষা আন্দোলন বাংলাদেশের ইতিহাসে জাতীয় চেতনার প্রথম সুসংগঠিত গণআন্দোলন। এই আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি জাতি শুধু মাতৃভাষার সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবি জানায়নি, বরং আত্মপরিচয়, সাংস্কৃতিক মর্যাদা এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের সংগ্রামেও ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে ছাত্রসমাজ, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক নেতাদের অবদান সর্বজনস্বীকৃত। তবে এই আন্দোলনের আরেকটি শক্তিশালী স্তম্ভ ছিল সংবাদপত্র। সংবাদপত্র জনমত সৃষ্টি, আন্দোলনের আদর্শ প্রচার, জনগণকে সংগঠিত করা এবং শাসকগোষ্ঠীর অপপ্রচারের জবাব দেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। এসব সংবাদপত্রের মধ্যে সাপ্তাহিক ‘সৈনিক’ ছিল সবচেয়ে সাহসী, সুদূরপ্রসারী এবং প্রভাবশালী পত্রিকাগুলোর অন্যতম। ভাষা আন্দোলনের বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি নির্মাণ, আন্দোলনের সাংগঠনিক প্রস্তুতি এবং সংগ্রামের প্রতিটি ধাপে জনগণের পাশে থেকে সত্য প্রকাশের কারণে ‘সৈনিক’ ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নাম।

দেশভাগের পর পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলেও ভাষার প্রশ্নে বৈষম্যের সূচনা ঘটে খুব দ্রুত। পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ বাংলা ভাষায় কথা বললেও পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার উদ্যোগ নেয়। এই সিদ্ধান্ত পূর্ব বাংলার মানুষের ভাষাগত, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অধিকারের পরিপন্থী ছিল। ফলে বুদ্ধিজীবী সমাজ, ছাত্রসমাজ এবং সচেতন নাগরিকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এই সময় ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক অধ্যাপক আবুল কাসেম উপলব্ধি করেন যে আন্দোলনকে সফল করতে হলে জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি এবং যুক্তিনির্ভর জনমত গড়ে তোলা অপরিহার্য। এই লক্ষ্যেই তাঁর প্রতিষ্ঠিত সাংস্কৃতিক সংগঠন তমদ্দুন মজলিস একটি শক্তিশালী সংবাদপত্র প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করে।

এই উদ্যোগের ফলেই ১৯৪৮ সালের ১৪ নভেম্বর প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক ‘সৈনিক’। তমদ্দুন মজলিসের মুখপত্র হলেও এটি কেবল একটি সাংগঠনিক পত্রিকা ছিল না; বরং অল্প সময়ের মধ্যেই এটি পূর্ব বাংলার মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে। ঢাকা আজিমপুরের ১৯ নম্বর বাসভবন ছিল তমদ্দুন মজলিস এবং ‘সৈনিক’-এর কার্যালয়। এখান থেকেই ভাষা আন্দোলনের বহু গুরুত্বপূর্ণ কর্মপরিকল্পনা প্রণীত হয় এবং পত্রিকার সম্পাদকীয় রচিত হতো।

সাপ্তাহিক ‘সৈনিক’-এর প্রথম সম্পাদক ছিলেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক শাহেদ আলী। সম্পাদকমণ্ডলীতে ছিলেন এনামুল হক। পরবর্তীকালে আবদুল গফুর, হাসান ইকবাল, মফিজউদ্দিন আহমদ, দিদারুল আলম খান, ফারুক মাহমুদ, সৈয়দ মোস্তাফা জামালসহ অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত হন। যদিও সম্পাদকীয় দায়িত্ব বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তিত হয়েছে, তবুও পত্রিকার মূল নীতিনির্ধারক হিসেবে অধ্যাপক আবুল কাসেম দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর চিন্তা, আদর্শ এবং রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ‘সৈনিক’-এর প্রতিটি সংখ্যায় প্রতিফলিত হয়েছে।

প্রকাশের শুরুতেই ‘সৈনিক’ তার আদর্শ ও লক্ষ্য স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে। প্রথম সম্পাদকীয়তে বলা হয়, সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষা, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা এবং অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করাই হবে পত্রিকার প্রধান উদ্দেশ্য। সেখানে স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করা হয়— “সৈনিক জনগণের হইয়া লড়াই করিয়া যাইবে এবং বাঁধা বা আঘাত যে কোনো দিক হইতেই আসুক, বীরের মতো তাহার সামনা-সামনি হইবে।” এই ঘোষণা শুধু একটি নীতিবাক্য ছিল না; বরং ভাষা আন্দোলনের প্রতিটি পর্যায়ে ‘সৈনিক’ বাস্তবেই সেই অঙ্গীকার রক্ষা করেছিল।

১৯৪৮ সাল থেকেই ‘সৈনিক’ বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ধারাবাহিকভাবে সংবাদ, সম্পাদকীয়, প্রবন্ধ ও বিশ্লেষণ প্রকাশ করতে থাকে। সে সময় সরকারি নিয়ন্ত্রিত প্রচারমাধ্যমে বাংলার দাবিকে উপেক্ষা করা হলেও ‘সৈনিক’ যুক্তি, ইতিহাস এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের আলোকে দেখাতে সক্ষম হয় যে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার দাবি সম্পূর্ণ ন্যায্য। পত্রিকাটি যুক্তি দেয় যে পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ভাষাকে অস্বীকার করা গণতন্ত্রের মৌলিক নীতির পরিপন্থী।

শুধু রাজনৈতিক যুক্তিই নয়, ‘সৈনিক’ ধর্মীয় যুক্তিও উপস্থাপন করে। বাংলা ভাষার দাবিকে ইসলামবিরোধী বলে যারা অপপ্রচার চালাত, তাদের জবাবে পত্রিকাটি পবিত্র কোরআনের সূরা ইবরাহিমের ৪ নম্বর আয়াত উদ্ধৃত করে লিখেছিল যে, আল্লাহ প্রত্যেক রাসুলকে তাঁর জাতির ভাষায় পাঠিয়েছেন যাতে মানুষ সহজে সত্য উপলব্ধি করতে পারে। অর্থাৎ মাতৃভাষার গুরুত্ব ইসলামের মৌলিক শিক্ষার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই ব্যাখ্যা সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলে এবং ভাষা আন্দোলনের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অপপ্রচার অনেকাংশে ব্যর্থ হয়।

একই সঙ্গে ‘সৈনিক’ লাহোর প্রস্তাবের আলোচনাও সামনে নিয়ে আসে। পত্রিকাটি দেখায় যে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ভিত্তি ছিল জনগণের অধিকার এবং আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের ধারণা। ফলে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি পাকিস্তানের ঐক্যের বিরুদ্ধে নয়; বরং প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শের সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই ধরনের বিশ্লেষণ ভাষা আন্দোলনকে একটি শক্তিশালী বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি প্রদান করে।

সাপ্তাহিক ‘সৈনিক’-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল এর নিরপেক্ষ ও জনমুখী সাংবাদিকতা। পত্রিকাটি কেবল ভাষার প্রশ্নেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং পূর্ব বাংলার অর্থনৈতিক বৈষম্য, প্রশাসনিক বঞ্চনা, শিক্ষানীতি, কৃষক-শ্রমিকের অধিকার, দুর্নীতি, সাম্প্রদায়িকতা এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের বিষয়েও ধারাবাহিকভাবে লিখেছে। ফলে সাধারণ মানুষ ‘সৈনিক’-কে নিজেদের পত্রিকা হিসেবে গ্রহণ করে।

১৯৪৯ সালে পত্রিকাটি দুর্নীতিবিরোধী বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে। ১৯৫০ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রেক্ষাপটে প্রকাশ করে দাঙ্গাবিরোধী সংখ্যা। পরে জমিদারি প্রথার অবসানের দাবিতে জমিদারিবিরোধী বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে। এসব বিশেষ সংখ্যায় গবেষণাধর্মী নিবন্ধ, প্রবন্ধ, কবিতা, গল্প ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়। এর মাধ্যমে ‘সৈনিক’ প্রমাণ করে যে একটি সংবাদপত্র শুধু খবর প্রকাশের মাধ্যম নয়; এটি সমাজ পরিবর্তনেরও শক্তিশালী হাতিয়ার।

পত্রিকাটির সাহিত্য ও শিল্পচর্চাও ছিল উল্লেখযোগ্য। বিখ্যাত শিল্পী কামরুল হাসান ‘সৈনিক’-এর মাস্টহেড অঙ্কন করেন। প্রখ্যাত কার্টুনিস্ট দোপেয়াজা (কাজী আবুল কাসেম) নিয়মিত রাজনৈতিক কার্টুন আঁকতেন। এসব কার্টুন পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্যমূলক নীতি, শাসকগোষ্ঠীর স্বৈরাচার এবং জনগণের দুর্ভোগকে অত্যন্ত শৈল্পিক ও ব্যঙ্গাত্মকভাবে তুলে ধরত। ফলে শিক্ষিত সমাজের পাশাপাশি সাধারণ পাঠকের কাছেও পত্রিকাটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।

১৯৫১ সালের দিকে ভাষা আন্দোলন নতুন গতি লাভ করে। পাকিস্তান সরকার বাংলা ভাষার দাবিকে দমন করতে আরও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে। এই সময় ‘সৈনিক’ তার সম্পাদকীয়তে বারবার সতর্ক করে দেয় যে ভাষার প্রশ্নে জনগণের ন্যায্য দাবি উপেক্ষা করলে দেশে ব্যাপক গণআন্দোলন সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে পত্রিকাটি ছাত্রসমাজকে সংগঠিত হওয়ার আহ্বান জানায় এবং ভাষার প্রশ্নকে জাতীয় অস্তিত্বের প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরে।

এই সময়ে তমদ্দুন মজলিস, রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতাদের বিভিন্ন কর্মসূচি ‘সৈনিক’ অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করতে থাকে। সংবাদ পরিবেশনের পাশাপাশি সম্পাদকীয় বিশ্লেষণের মাধ্যমে আন্দোলনের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করা হতো। ফলে আন্দোলনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সাধারণ মানুষের কাছে পরিষ্কার হয়ে ওঠে।

১৯৫২ সালের জানুয়ারিতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ঘোষণা দেন যে উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। এই ঘোষণার বিরুদ্ধে ‘সৈনিক’ তীব্র প্রতিবাদ জানায়। পত্রিকাটি বড় শিরোনামে প্রকাশ করে— “উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করিবার চক্রান্তকে রুখিয়া দাঁড়াইতে হইবে।” একই সঙ্গে নাজিমুদ্দিনের বক্তব্যের বিরুদ্ধে সারা দেশে যে প্রতিবাদ শুরু হয়, তার বিস্তারিত সংবাদ প্রকাশ করে। এই প্রতিবেদনগুলো ভাষা আন্দোলনকে আরও বেগবান করে এবং জনগণকে সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এরপর ফেব্রুয়ারির শুরু থেকেই ‘সৈনিক’ ৪ ফেব্রুয়ারির ছাত্র ধর্মঘট, সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সিদ্ধান্ত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সভা এবং ২১ ফেব্রুয়ারির কর্মসূচি ধারাবাহিকভাবে প্রচার করতে থাকে। সরকার যখন সংবাদপত্রের ওপর সেন্সরশিপ আরোপ করে এবং সরকারি প্রেসনোট ছাড়া অন্য কিছু প্রকাশে বাধা দেয়, তখনও ‘সৈনিক’ সত্য প্রকাশের সাহস হারায়নি। জনগণের জানার অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পত্রিকাটি সরকারের নির্দেশ অমান্য করে বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরে।

১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ভাষা আন্দোলন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যায়। পাকিস্তান সরকার বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার নীতিতে অটল থাকে। এর প্রতিবাদে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ২১ ফেব্রুয়ারি ধর্মঘট ও বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা আন্দোলনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। এই সময় সাপ্তাহিক ‘সৈনিক’ কেবল সংবাদ পরিবেশন করেনি, বরং জনগণকে আন্দোলনের উদ্দেশ্য, কর্মসূচি এবং নৈতিক ভিত্তি সম্পর্কে সচেতন করে তুলেছিল। পত্রিকার সম্পাদকীয়, সংবাদ, বিশ্লেষণ এবং বিশেষ নিবন্ধে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল যে বাংলা ভাষার দাবি কোনো আঞ্চলিক বা সাম্প্রদায়িক দাবি নয়; এটি পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ন্যায্য সাংবিধানিক অধিকার।

ফেব্রুয়ারির শুরু থেকেই ‘সৈনিক’ প্রতিদিনের আন্দোলনের খবর, ছাত্রদের সভা, ধর্মঘট, মিছিল, সংগ্রাম পরিষদের সিদ্ধান্ত এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বিবৃতি গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করতে থাকে। ১০ ফেব্রুয়ারির সংখ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও শহরের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের ধর্মঘটের বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশিত হয়। একই সংখ্যার সম্পাদকীয়তে স্পষ্ট ভাষায় লেখা হয় যে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা একমাত্র উর্দু হতে পারে না; কারণ পূর্ব বাংলার বিপুল জনগোষ্ঠী বাংলাকেই রাষ্ট্রভাষা হিসেবে দেখতে চায়।

২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সকাল থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সরকার ১৪৪ ধারা জারি করলেও ছাত্রসমাজ সেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মিছিল বের করে। পুলিশ টিয়ার গ্যাস, লাঠিচার্জ এবং পরে গুলিবর্ষণ করে। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ অনেক ছাত্র ও সাধারণ মানুষ শহীদ হন। এই নির্মম হত্যাকাণ্ডে সমগ্র পূর্ব বাংলা শোক, ক্ষোভ ও প্রতিবাদে ফেটে পড়ে।

এই ঘটনার পর সাপ্তাহিক ‘সৈনিক’ ইতিহাস সৃষ্টি করে। ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হয় তাদের বিখ্যাত ‘শহীদ সংখ্যা’। এটি লাল কালি এবং লাল বর্ডারে ছাপা হয়, যা ছিল শহীদদের রক্তের প্রতীক। প্রথম পাতার প্রধান শিরোনাম ছিল—“শহীদ ছাত্রদের তাজা রক্তে রাজধানী ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত।” আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিরোনাম ছিল—“রক্তের বিনিময়ে রাষ্ট্রভাষা করার শপথ।” এই সংখ্যা মুহূর্তের মধ্যেই পাঠকদের হাতে হাতে পৌঁছে যায়। বিপুল চাহিদার কারণে একই দিনে একাধিক সংস্করণ ছাপতে হয়। ঢাকা ছাড়াও মফস্বল শহরগুলোতে এই সংখ্যা ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং আন্দোলনের প্রতি মানুষের সমর্থন আরও সুদৃঢ় হয়।

‘সৈনিক’-এর এই নির্ভীক ভূমিকা পাকিস্তান সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। সরকার অধ্যাপক আবুল কাসেম, আবদুল গফুরসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। ২৩ ফেব্রুয়ারি পুলিশ আজিমপুরের ১৯ নম্বর বাসা, অর্থাৎ তমদ্দুন মজলিস ও ‘সৈনিক’-এর কার্যালয় ঘেরাও করে। অধ্যাপক আবুল কাসেম পরে স্মৃতিচারণায় উল্লেখ করেন যে, তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা রাতের অন্ধকারে পেছনের পথ দিয়ে পালিয়ে আত্মগোপন করতে বাধ্য হন। কিছুদিন তাঁরা গোপনে অবস্থান করেন এবং পরে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে ভাষা আন্দোলনে ‘সৈনিক’-এর ভূমিকা পাকিস্তান সরকার কতটা ভয় পেয়েছিল।

ভাষা আন্দোলনের সময় ‘সৈনিক’ কেবল প্রতিবাদই করেনি; আন্দোলনের যৌক্তিক ভিত্তিও তুলে ধরেছিল। সম্পাদকীয়তে বলা হয়, ভাষার প্রশ্ন কোনো আবেগের বিষয় নয়; এটি জাতীয় মর্যাদা, শিক্ষা, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা এবং সাংবিধানিক অধিকারের প্রশ্ন। পত্রিকাটি যুক্তি দেয়, মাতৃভাষাকে অস্বীকার করে কোনো জাতির উন্নতি সম্ভব নয়। জনগণের ভাষাকে রাষ্ট্রের ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি না দিলে গণতন্ত্র অর্থহীন হয়ে পড়বে।

‘সৈনিক’-এর আরেকটি উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে জনগণের দৈনন্দিন জীবন ও অর্থনৈতিক বঞ্চনার সম্পর্ক তুলে ধরা। তারা দেখায়, ভাষাগত বৈষম্যের পাশাপাশি পূর্ব বাংলার মানুষ অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও বৈষম্যের শিকার। ফলে ভাষা আন্দোলন শুধু ভাষার দাবি নয়; এটি ন্যায়বিচার, সমঅধিকার এবং আত্মমর্যাদার সংগ্রাম। এই বিশ্লেষণ আন্দোলনকে ছাত্রসমাজের গণ্ডি থেকে সাধারণ মানুষের আন্দোলনে পরিণত করতে সহায়তা করে।

ভাষা আন্দোলনের সময় ‘সৈনিক’-এর সম্পাদকীয়গুলো ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। এগুলোতে সরকারের দমননীতি, পুলিশি নির্যাতন এবং জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের কঠোর সমালোচনা করা হয়। একই সঙ্গে জনগণকে শান্তিপূর্ণ কিন্তু দৃঢ় আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়। এসব লেখার ভাষা ছিল যুক্তিনির্ভর, তথ্যসমৃদ্ধ এবং সাহসী।

ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে সংবাদপত্রগুলোর মধ্যে ‘সৈনিক’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলেও আরও কয়েকটি পত্রিকা আন্দোলনের পক্ষে ভূমিকা পালন করে। সাপ্তাহিক ইনসাফ, দৈনিক ইত্তেহাদ, নওবেলাল, মিল্লাত, আজাদ এবং পাকিস্তান অবজারভার বিভিন্ন সময়ে ভাষা আন্দোলনের সংবাদ প্রকাশ করে। তবে গবেষকদের মতে, ভাষা আন্দোলনের বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি নির্মাণ, ধারাবাহিক সম্পাদকীয় প্রকাশ এবং সরকারি দমননীতিকে উপেক্ষা করে নির্ভীক অবস্থান গ্রহণের ক্ষেত্রে ‘সৈনিক’ ছিল সবচেয়ে অগ্রগণ্য।

সাপ্তাহিক ‘সৈনিক’ শুধু ভাষা আন্দোলনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের দাবি, কৃষক-শ্রমিকের অধিকার, দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নেও ধারাবাহিকভাবে লিখেছে। ফলে ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই যে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটে, ‘সৈনিক’ তার অন্যতম প্রধান বুদ্ধিবৃত্তিক বাহক হয়ে ওঠে। পরবর্তীকালে ছয় দফা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান এবং মুক্তিযুদ্ধের পেছনেও ভাষা আন্দোলনের যে চেতনা কাজ করেছে, সেই চেতনার বিকাশে ‘সৈনিক’-এর অবদান অনস্বীকার্য।

১৯৫৮ সালের পর অর্থনৈতিক সংকট এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে ‘সৈনিক’-এর প্রকাশনা অনিয়মিত হয়ে পড়ে। পরে এটি বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু ১৯৭০ সালে স্বাধিকার আন্দোলনের উত্তাল সময়ে পুনরায় প্রকাশিত হয়। আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানসহ জাতীয় নেতারা এর পুনঃপ্রকাশকে স্বাগত জানান। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বর অভিযানের সময় পত্রিকার ব্যবস্থাপক নুরুর রহমান জামালী শহীদ হন এবং পত্রিকার প্রকাশনা আবার বন্ধ হয়ে যায়। স্বাধীনতার পর ১৯৭৭ সালে পুনরায় প্রকাশিত হলেও আর দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারেনি। তবুও ইতিহাসে এর মর্যাদা অমলিন।

আজ ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে স্পষ্টভাবে দেখা যায় যে, একটি সংবাদপত্র কীভাবে একটি জাতির চেতনাকে জাগিয়ে তুলতে পারে, তার সর্বোত্তম উদাহরণ সাপ্তাহিক ‘সৈনিক’। এটি জনগণের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিল, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিল, সত্য প্রকাশে আপসহীন ছিল এবং ভাষা আন্দোলনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তকে ইতিহাসের পাতায় সংরক্ষণ করেছিল। ভাষা শহীদদের রক্তের মূল্য, বাংলার প্রতি মানুষের আবেগ এবং ন্যায়ের সংগ্রামকে ‘সৈনিক’ এমনভাবে তুলে ধরেছিল, যা আজও গবেষক ও ইতিহাসবিদদের জন্য মূল্যবান দলিল।

ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউরসহ সকল শহীদের আত্মত্যাগ যেমন চিরস্মরণীয়, তেমনি তাঁদের সংগ্রামের কথা নির্ভয়ে জাতির সামনে তুলে ধরা সাপ্তাহিক ‘সৈনিক’-এর সাংবাদিক, সম্পাদক ও লেখকদের অবদানও সমানভাবে শ্রদ্ধার দাবিদার। তাঁদের কলম ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অস্ত্র এবং বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের শক্তিশালী হাতিয়ার।

সবশেষে বলা যায়, তমদ্দুন মজলিসের মুখপত্র ‘সাপ্তাহিক সৈনিক’ ছিল ভাষা আন্দোলনের এক নির্ভীক মুখপত্র, একটি সংগ্রামী সংবাদপত্র এবং বাঙালির জাতীয় চেতনার অন্যতম নির্মাতা। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে এর অবদান কেবল সাংবাদিকতার ইতিহাস নয়; এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র এবং জাতীয় পরিচয়ের বিকাশের ইতিহাসেরও এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।

তথ্যসূত্র:
১. বাংলাপিডিয়া।
২. সাপ্তাহিক বিচিত্রা, ২৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৩।
৩. দৈনিক ইনকিলাব, ১৬ নভেম্বর ২০১৭।
৪. প্রথম আলো, ২১ পেব্রুয়ারি ২০২০।
৫. বণিক বার্তা, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫।
৬. দৈনিক নয়া দিগন্ত, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬।
৭. ভাষাসৈনিক বদরুজ্জামান ও আব্দুল গফুরের স্মৃতিচারণ হতে।

লেখক: লে. কর্নেল এম. আতাউর রহমান পীর
সাবেক প্রিন্সিপাল, মদন মোহন কলেজ, সিলেট

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

ভাষা আন্দোলনে তমদ্দুন মজলিসের মুখপত্র ‘সাপ্তাহিক সৈনিক’ পত্রিকার ভূমিকা -এম আতাউর রহমান পীর

ভাষা আন্দোলনে তমদ্দুন মজলিসের মুখপত্র ‘সাপ্তাহিক সৈনিক’ পত্রিকার ভূমিকা -এম আতাউর রহমান পীর

Update Time : ৩ ঘন্টা আগে

মহান ভাষা আন্দোলন বাংলাদেশের ইতিহাসে জাতীয় চেতনার প্রথম সুসংগঠিত গণআন্দোলন। এই আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি জাতি শুধু মাতৃভাষার সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবি জানায়নি, বরং আত্মপরিচয়, সাংস্কৃতিক মর্যাদা এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের সংগ্রামেও ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে ছাত্রসমাজ, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক নেতাদের অবদান সর্বজনস্বীকৃত। তবে এই আন্দোলনের আরেকটি শক্তিশালী স্তম্ভ ছিল সংবাদপত্র। সংবাদপত্র জনমত সৃষ্টি, আন্দোলনের আদর্শ প্রচার, জনগণকে সংগঠিত করা এবং শাসকগোষ্ঠীর অপপ্রচারের জবাব দেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। এসব সংবাদপত্রের মধ্যে সাপ্তাহিক ‘সৈনিক’ ছিল সবচেয়ে সাহসী, সুদূরপ্রসারী এবং প্রভাবশালী পত্রিকাগুলোর অন্যতম। ভাষা আন্দোলনের বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি নির্মাণ, আন্দোলনের সাংগঠনিক প্রস্তুতি এবং সংগ্রামের প্রতিটি ধাপে জনগণের পাশে থেকে সত্য প্রকাশের কারণে ‘সৈনিক’ ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নাম।

দেশভাগের পর পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলেও ভাষার প্রশ্নে বৈষম্যের সূচনা ঘটে খুব দ্রুত। পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ বাংলা ভাষায় কথা বললেও পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার উদ্যোগ নেয়। এই সিদ্ধান্ত পূর্ব বাংলার মানুষের ভাষাগত, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অধিকারের পরিপন্থী ছিল। ফলে বুদ্ধিজীবী সমাজ, ছাত্রসমাজ এবং সচেতন নাগরিকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এই সময় ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক অধ্যাপক আবুল কাসেম উপলব্ধি করেন যে আন্দোলনকে সফল করতে হলে জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি এবং যুক্তিনির্ভর জনমত গড়ে তোলা অপরিহার্য। এই লক্ষ্যেই তাঁর প্রতিষ্ঠিত সাংস্কৃতিক সংগঠন তমদ্দুন মজলিস একটি শক্তিশালী সংবাদপত্র প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করে।

এই উদ্যোগের ফলেই ১৯৪৮ সালের ১৪ নভেম্বর প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক ‘সৈনিক’। তমদ্দুন মজলিসের মুখপত্র হলেও এটি কেবল একটি সাংগঠনিক পত্রিকা ছিল না; বরং অল্প সময়ের মধ্যেই এটি পূর্ব বাংলার মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে। ঢাকা আজিমপুরের ১৯ নম্বর বাসভবন ছিল তমদ্দুন মজলিস এবং ‘সৈনিক’-এর কার্যালয়। এখান থেকেই ভাষা আন্দোলনের বহু গুরুত্বপূর্ণ কর্মপরিকল্পনা প্রণীত হয় এবং পত্রিকার সম্পাদকীয় রচিত হতো।

সাপ্তাহিক ‘সৈনিক’-এর প্রথম সম্পাদক ছিলেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক শাহেদ আলী। সম্পাদকমণ্ডলীতে ছিলেন এনামুল হক। পরবর্তীকালে আবদুল গফুর, হাসান ইকবাল, মফিজউদ্দিন আহমদ, দিদারুল আলম খান, ফারুক মাহমুদ, সৈয়দ মোস্তাফা জামালসহ অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত হন। যদিও সম্পাদকীয় দায়িত্ব বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তিত হয়েছে, তবুও পত্রিকার মূল নীতিনির্ধারক হিসেবে অধ্যাপক আবুল কাসেম দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর চিন্তা, আদর্শ এবং রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ‘সৈনিক’-এর প্রতিটি সংখ্যায় প্রতিফলিত হয়েছে।

প্রকাশের শুরুতেই ‘সৈনিক’ তার আদর্শ ও লক্ষ্য স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে। প্রথম সম্পাদকীয়তে বলা হয়, সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষা, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা এবং অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করাই হবে পত্রিকার প্রধান উদ্দেশ্য। সেখানে স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করা হয়— “সৈনিক জনগণের হইয়া লড়াই করিয়া যাইবে এবং বাঁধা বা আঘাত যে কোনো দিক হইতেই আসুক, বীরের মতো তাহার সামনা-সামনি হইবে।” এই ঘোষণা শুধু একটি নীতিবাক্য ছিল না; বরং ভাষা আন্দোলনের প্রতিটি পর্যায়ে ‘সৈনিক’ বাস্তবেই সেই অঙ্গীকার রক্ষা করেছিল।

১৯৪৮ সাল থেকেই ‘সৈনিক’ বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ধারাবাহিকভাবে সংবাদ, সম্পাদকীয়, প্রবন্ধ ও বিশ্লেষণ প্রকাশ করতে থাকে। সে সময় সরকারি নিয়ন্ত্রিত প্রচারমাধ্যমে বাংলার দাবিকে উপেক্ষা করা হলেও ‘সৈনিক’ যুক্তি, ইতিহাস এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের আলোকে দেখাতে সক্ষম হয় যে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার দাবি সম্পূর্ণ ন্যায্য। পত্রিকাটি যুক্তি দেয় যে পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ভাষাকে অস্বীকার করা গণতন্ত্রের মৌলিক নীতির পরিপন্থী।

শুধু রাজনৈতিক যুক্তিই নয়, ‘সৈনিক’ ধর্মীয় যুক্তিও উপস্থাপন করে। বাংলা ভাষার দাবিকে ইসলামবিরোধী বলে যারা অপপ্রচার চালাত, তাদের জবাবে পত্রিকাটি পবিত্র কোরআনের সূরা ইবরাহিমের ৪ নম্বর আয়াত উদ্ধৃত করে লিখেছিল যে, আল্লাহ প্রত্যেক রাসুলকে তাঁর জাতির ভাষায় পাঠিয়েছেন যাতে মানুষ সহজে সত্য উপলব্ধি করতে পারে। অর্থাৎ মাতৃভাষার গুরুত্ব ইসলামের মৌলিক শিক্ষার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই ব্যাখ্যা সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলে এবং ভাষা আন্দোলনের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অপপ্রচার অনেকাংশে ব্যর্থ হয়।

একই সঙ্গে ‘সৈনিক’ লাহোর প্রস্তাবের আলোচনাও সামনে নিয়ে আসে। পত্রিকাটি দেখায় যে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ভিত্তি ছিল জনগণের অধিকার এবং আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের ধারণা। ফলে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি পাকিস্তানের ঐক্যের বিরুদ্ধে নয়; বরং প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শের সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই ধরনের বিশ্লেষণ ভাষা আন্দোলনকে একটি শক্তিশালী বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি প্রদান করে।

সাপ্তাহিক ‘সৈনিক’-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল এর নিরপেক্ষ ও জনমুখী সাংবাদিকতা। পত্রিকাটি কেবল ভাষার প্রশ্নেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং পূর্ব বাংলার অর্থনৈতিক বৈষম্য, প্রশাসনিক বঞ্চনা, শিক্ষানীতি, কৃষক-শ্রমিকের অধিকার, দুর্নীতি, সাম্প্রদায়িকতা এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের বিষয়েও ধারাবাহিকভাবে লিখেছে। ফলে সাধারণ মানুষ ‘সৈনিক’-কে নিজেদের পত্রিকা হিসেবে গ্রহণ করে।

১৯৪৯ সালে পত্রিকাটি দুর্নীতিবিরোধী বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে। ১৯৫০ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রেক্ষাপটে প্রকাশ করে দাঙ্গাবিরোধী সংখ্যা। পরে জমিদারি প্রথার অবসানের দাবিতে জমিদারিবিরোধী বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে। এসব বিশেষ সংখ্যায় গবেষণাধর্মী নিবন্ধ, প্রবন্ধ, কবিতা, গল্প ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়। এর মাধ্যমে ‘সৈনিক’ প্রমাণ করে যে একটি সংবাদপত্র শুধু খবর প্রকাশের মাধ্যম নয়; এটি সমাজ পরিবর্তনেরও শক্তিশালী হাতিয়ার।

পত্রিকাটির সাহিত্য ও শিল্পচর্চাও ছিল উল্লেখযোগ্য। বিখ্যাত শিল্পী কামরুল হাসান ‘সৈনিক’-এর মাস্টহেড অঙ্কন করেন। প্রখ্যাত কার্টুনিস্ট দোপেয়াজা (কাজী আবুল কাসেম) নিয়মিত রাজনৈতিক কার্টুন আঁকতেন। এসব কার্টুন পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্যমূলক নীতি, শাসকগোষ্ঠীর স্বৈরাচার এবং জনগণের দুর্ভোগকে অত্যন্ত শৈল্পিক ও ব্যঙ্গাত্মকভাবে তুলে ধরত। ফলে শিক্ষিত সমাজের পাশাপাশি সাধারণ পাঠকের কাছেও পত্রিকাটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।

১৯৫১ সালের দিকে ভাষা আন্দোলন নতুন গতি লাভ করে। পাকিস্তান সরকার বাংলা ভাষার দাবিকে দমন করতে আরও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে। এই সময় ‘সৈনিক’ তার সম্পাদকীয়তে বারবার সতর্ক করে দেয় যে ভাষার প্রশ্নে জনগণের ন্যায্য দাবি উপেক্ষা করলে দেশে ব্যাপক গণআন্দোলন সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে পত্রিকাটি ছাত্রসমাজকে সংগঠিত হওয়ার আহ্বান জানায় এবং ভাষার প্রশ্নকে জাতীয় অস্তিত্বের প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরে।

এই সময়ে তমদ্দুন মজলিস, রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতাদের বিভিন্ন কর্মসূচি ‘সৈনিক’ অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করতে থাকে। সংবাদ পরিবেশনের পাশাপাশি সম্পাদকীয় বিশ্লেষণের মাধ্যমে আন্দোলনের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করা হতো। ফলে আন্দোলনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সাধারণ মানুষের কাছে পরিষ্কার হয়ে ওঠে।

১৯৫২ সালের জানুয়ারিতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ঘোষণা দেন যে উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। এই ঘোষণার বিরুদ্ধে ‘সৈনিক’ তীব্র প্রতিবাদ জানায়। পত্রিকাটি বড় শিরোনামে প্রকাশ করে— “উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করিবার চক্রান্তকে রুখিয়া দাঁড়াইতে হইবে।” একই সঙ্গে নাজিমুদ্দিনের বক্তব্যের বিরুদ্ধে সারা দেশে যে প্রতিবাদ শুরু হয়, তার বিস্তারিত সংবাদ প্রকাশ করে। এই প্রতিবেদনগুলো ভাষা আন্দোলনকে আরও বেগবান করে এবং জনগণকে সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এরপর ফেব্রুয়ারির শুরু থেকেই ‘সৈনিক’ ৪ ফেব্রুয়ারির ছাত্র ধর্মঘট, সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সিদ্ধান্ত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সভা এবং ২১ ফেব্রুয়ারির কর্মসূচি ধারাবাহিকভাবে প্রচার করতে থাকে। সরকার যখন সংবাদপত্রের ওপর সেন্সরশিপ আরোপ করে এবং সরকারি প্রেসনোট ছাড়া অন্য কিছু প্রকাশে বাধা দেয়, তখনও ‘সৈনিক’ সত্য প্রকাশের সাহস হারায়নি। জনগণের জানার অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পত্রিকাটি সরকারের নির্দেশ অমান্য করে বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরে।

১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ভাষা আন্দোলন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যায়। পাকিস্তান সরকার বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার নীতিতে অটল থাকে। এর প্রতিবাদে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ২১ ফেব্রুয়ারি ধর্মঘট ও বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা আন্দোলনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। এই সময় সাপ্তাহিক ‘সৈনিক’ কেবল সংবাদ পরিবেশন করেনি, বরং জনগণকে আন্দোলনের উদ্দেশ্য, কর্মসূচি এবং নৈতিক ভিত্তি সম্পর্কে সচেতন করে তুলেছিল। পত্রিকার সম্পাদকীয়, সংবাদ, বিশ্লেষণ এবং বিশেষ নিবন্ধে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল যে বাংলা ভাষার দাবি কোনো আঞ্চলিক বা সাম্প্রদায়িক দাবি নয়; এটি পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ন্যায্য সাংবিধানিক অধিকার।

ফেব্রুয়ারির শুরু থেকেই ‘সৈনিক’ প্রতিদিনের আন্দোলনের খবর, ছাত্রদের সভা, ধর্মঘট, মিছিল, সংগ্রাম পরিষদের সিদ্ধান্ত এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বিবৃতি গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করতে থাকে। ১০ ফেব্রুয়ারির সংখ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও শহরের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের ধর্মঘটের বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশিত হয়। একই সংখ্যার সম্পাদকীয়তে স্পষ্ট ভাষায় লেখা হয় যে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা একমাত্র উর্দু হতে পারে না; কারণ পূর্ব বাংলার বিপুল জনগোষ্ঠী বাংলাকেই রাষ্ট্রভাষা হিসেবে দেখতে চায়।

২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সকাল থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সরকার ১৪৪ ধারা জারি করলেও ছাত্রসমাজ সেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মিছিল বের করে। পুলিশ টিয়ার গ্যাস, লাঠিচার্জ এবং পরে গুলিবর্ষণ করে। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ অনেক ছাত্র ও সাধারণ মানুষ শহীদ হন। এই নির্মম হত্যাকাণ্ডে সমগ্র পূর্ব বাংলা শোক, ক্ষোভ ও প্রতিবাদে ফেটে পড়ে।

এই ঘটনার পর সাপ্তাহিক ‘সৈনিক’ ইতিহাস সৃষ্টি করে। ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হয় তাদের বিখ্যাত ‘শহীদ সংখ্যা’। এটি লাল কালি এবং লাল বর্ডারে ছাপা হয়, যা ছিল শহীদদের রক্তের প্রতীক। প্রথম পাতার প্রধান শিরোনাম ছিল—“শহীদ ছাত্রদের তাজা রক্তে রাজধানী ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত।” আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিরোনাম ছিল—“রক্তের বিনিময়ে রাষ্ট্রভাষা করার শপথ।” এই সংখ্যা মুহূর্তের মধ্যেই পাঠকদের হাতে হাতে পৌঁছে যায়। বিপুল চাহিদার কারণে একই দিনে একাধিক সংস্করণ ছাপতে হয়। ঢাকা ছাড়াও মফস্বল শহরগুলোতে এই সংখ্যা ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং আন্দোলনের প্রতি মানুষের সমর্থন আরও সুদৃঢ় হয়।

‘সৈনিক’-এর এই নির্ভীক ভূমিকা পাকিস্তান সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। সরকার অধ্যাপক আবুল কাসেম, আবদুল গফুরসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। ২৩ ফেব্রুয়ারি পুলিশ আজিমপুরের ১৯ নম্বর বাসা, অর্থাৎ তমদ্দুন মজলিস ও ‘সৈনিক’-এর কার্যালয় ঘেরাও করে। অধ্যাপক আবুল কাসেম পরে স্মৃতিচারণায় উল্লেখ করেন যে, তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা রাতের অন্ধকারে পেছনের পথ দিয়ে পালিয়ে আত্মগোপন করতে বাধ্য হন। কিছুদিন তাঁরা গোপনে অবস্থান করেন এবং পরে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে ভাষা আন্দোলনে ‘সৈনিক’-এর ভূমিকা পাকিস্তান সরকার কতটা ভয় পেয়েছিল।

ভাষা আন্দোলনের সময় ‘সৈনিক’ কেবল প্রতিবাদই করেনি; আন্দোলনের যৌক্তিক ভিত্তিও তুলে ধরেছিল। সম্পাদকীয়তে বলা হয়, ভাষার প্রশ্ন কোনো আবেগের বিষয় নয়; এটি জাতীয় মর্যাদা, শিক্ষা, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা এবং সাংবিধানিক অধিকারের প্রশ্ন। পত্রিকাটি যুক্তি দেয়, মাতৃভাষাকে অস্বীকার করে কোনো জাতির উন্নতি সম্ভব নয়। জনগণের ভাষাকে রাষ্ট্রের ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি না দিলে গণতন্ত্র অর্থহীন হয়ে পড়বে।

‘সৈনিক’-এর আরেকটি উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে জনগণের দৈনন্দিন জীবন ও অর্থনৈতিক বঞ্চনার সম্পর্ক তুলে ধরা। তারা দেখায়, ভাষাগত বৈষম্যের পাশাপাশি পূর্ব বাংলার মানুষ অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও বৈষম্যের শিকার। ফলে ভাষা আন্দোলন শুধু ভাষার দাবি নয়; এটি ন্যায়বিচার, সমঅধিকার এবং আত্মমর্যাদার সংগ্রাম। এই বিশ্লেষণ আন্দোলনকে ছাত্রসমাজের গণ্ডি থেকে সাধারণ মানুষের আন্দোলনে পরিণত করতে সহায়তা করে।

ভাষা আন্দোলনের সময় ‘সৈনিক’-এর সম্পাদকীয়গুলো ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। এগুলোতে সরকারের দমননীতি, পুলিশি নির্যাতন এবং জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের কঠোর সমালোচনা করা হয়। একই সঙ্গে জনগণকে শান্তিপূর্ণ কিন্তু দৃঢ় আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়। এসব লেখার ভাষা ছিল যুক্তিনির্ভর, তথ্যসমৃদ্ধ এবং সাহসী।

ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে সংবাদপত্রগুলোর মধ্যে ‘সৈনিক’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলেও আরও কয়েকটি পত্রিকা আন্দোলনের পক্ষে ভূমিকা পালন করে। সাপ্তাহিক ইনসাফ, দৈনিক ইত্তেহাদ, নওবেলাল, মিল্লাত, আজাদ এবং পাকিস্তান অবজারভার বিভিন্ন সময়ে ভাষা আন্দোলনের সংবাদ প্রকাশ করে। তবে গবেষকদের মতে, ভাষা আন্দোলনের বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি নির্মাণ, ধারাবাহিক সম্পাদকীয় প্রকাশ এবং সরকারি দমননীতিকে উপেক্ষা করে নির্ভীক অবস্থান গ্রহণের ক্ষেত্রে ‘সৈনিক’ ছিল সবচেয়ে অগ্রগণ্য।

সাপ্তাহিক ‘সৈনিক’ শুধু ভাষা আন্দোলনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের দাবি, কৃষক-শ্রমিকের অধিকার, দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নেও ধারাবাহিকভাবে লিখেছে। ফলে ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই যে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটে, ‘সৈনিক’ তার অন্যতম প্রধান বুদ্ধিবৃত্তিক বাহক হয়ে ওঠে। পরবর্তীকালে ছয় দফা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান এবং মুক্তিযুদ্ধের পেছনেও ভাষা আন্দোলনের যে চেতনা কাজ করেছে, সেই চেতনার বিকাশে ‘সৈনিক’-এর অবদান অনস্বীকার্য।

১৯৫৮ সালের পর অর্থনৈতিক সংকট এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে ‘সৈনিক’-এর প্রকাশনা অনিয়মিত হয়ে পড়ে। পরে এটি বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু ১৯৭০ সালে স্বাধিকার আন্দোলনের উত্তাল সময়ে পুনরায় প্রকাশিত হয়। আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানসহ জাতীয় নেতারা এর পুনঃপ্রকাশকে স্বাগত জানান। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বর অভিযানের সময় পত্রিকার ব্যবস্থাপক নুরুর রহমান জামালী শহীদ হন এবং পত্রিকার প্রকাশনা আবার বন্ধ হয়ে যায়। স্বাধীনতার পর ১৯৭৭ সালে পুনরায় প্রকাশিত হলেও আর দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারেনি। তবুও ইতিহাসে এর মর্যাদা অমলিন।

আজ ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে স্পষ্টভাবে দেখা যায় যে, একটি সংবাদপত্র কীভাবে একটি জাতির চেতনাকে জাগিয়ে তুলতে পারে, তার সর্বোত্তম উদাহরণ সাপ্তাহিক ‘সৈনিক’। এটি জনগণের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিল, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিল, সত্য প্রকাশে আপসহীন ছিল এবং ভাষা আন্দোলনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তকে ইতিহাসের পাতায় সংরক্ষণ করেছিল। ভাষা শহীদদের রক্তের মূল্য, বাংলার প্রতি মানুষের আবেগ এবং ন্যায়ের সংগ্রামকে ‘সৈনিক’ এমনভাবে তুলে ধরেছিল, যা আজও গবেষক ও ইতিহাসবিদদের জন্য মূল্যবান দলিল।

ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউরসহ সকল শহীদের আত্মত্যাগ যেমন চিরস্মরণীয়, তেমনি তাঁদের সংগ্রামের কথা নির্ভয়ে জাতির সামনে তুলে ধরা সাপ্তাহিক ‘সৈনিক’-এর সাংবাদিক, সম্পাদক ও লেখকদের অবদানও সমানভাবে শ্রদ্ধার দাবিদার। তাঁদের কলম ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অস্ত্র এবং বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের শক্তিশালী হাতিয়ার।

সবশেষে বলা যায়, তমদ্দুন মজলিসের মুখপত্র ‘সাপ্তাহিক সৈনিক’ ছিল ভাষা আন্দোলনের এক নির্ভীক মুখপত্র, একটি সংগ্রামী সংবাদপত্র এবং বাঙালির জাতীয় চেতনার অন্যতম নির্মাতা। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে এর অবদান কেবল সাংবাদিকতার ইতিহাস নয়; এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র এবং জাতীয় পরিচয়ের বিকাশের ইতিহাসেরও এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।

তথ্যসূত্র:
১. বাংলাপিডিয়া।
২. সাপ্তাহিক বিচিত্রা, ২৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৩।
৩. দৈনিক ইনকিলাব, ১৬ নভেম্বর ২০১৭।
৪. প্রথম আলো, ২১ পেব্রুয়ারি ২০২০।
৫. বণিক বার্তা, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫।
৬. দৈনিক নয়া দিগন্ত, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬।
৭. ভাষাসৈনিক বদরুজ্জামান ও আব্দুল গফুরের স্মৃতিচারণ হতে।

লেখক: লে. কর্নেল এম. আতাউর রহমান পীর
সাবেক প্রিন্সিপাল, মদন মোহন কলেজ, সিলেট