Dhaka , রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
​ভাষাসৈনিক বদরুজ্জামান ও আমাদের দায়িত্ব। ​– ড. মো. আবু তাহের কাতারে মরহুম আব্দুল্লাহ আল মামুন রেনুর রুহের মাগফেরাত কামনায় দোয়া মাহফিল জনকল্যাণ ফাউন্ডেশনের যাত্রা শুরু সেবা ও ন্যায্যমূল্যে পণ্য সরবরাহের প্রত্যয় এলাকার মানুষের মতামত ও সহযোগিতা নিয়ে এগোতে চান চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী আব্দুল জব্বার সিদ্দিকী গোলাপগঞ্জ উপজেলা প্রেসক্লাবের জরুরী সভা অনুষ্ঠিত আলী আমজদ উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে নবাগত শিক্ষার্থীদের নবীন বরণ যুক্তরাজ্য প্রবাসীর বাড়িতে নির্মাণকাজে বাধা ও চাঁদা দাবির অভিযোগ ‎নজরুল বর্ষে রাজনগরে সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরন। লন্ডনে কুলাউড়া ইউনিয়নভিত্তিক ফুটবল টুর্নামেন্ট কুলাউড়ায় মাদক সেবনে বাধা-ছোট ভাইয়ের আঘাতে বড় ভাই আহত

​ভাষাসৈনিক বদরুজ্জামান ও আমাদের দায়িত্ব। ​– ড. মো. আবু তাহের

  • Reporter Name
  • Update Time : ১৩ ঘন্টা আগে
  • ২২ Time View

ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; ভাষা একটি জাতির আত্মপরিচয়, অস্তিত্ব ও অধিকারবোধের প্রতীক। বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে যে অসংখ্য মানুষ জীবন, শ্রম ও সাহস দিয়ে ভূমিকা রেখেছেন, তাঁদের অনেকের অবদান আজও জাতীয় ইতিহাসে যথাযথভাবে স্থান পায়নি। তাঁদেরই একজন ভাষাসৈনিক বদরুজ্জামান। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দের ১লা মার্চে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মিরপুর গ্রামে। ভাষা আন্দোলনের উত্তাল সময়ে বদরুজ্জামান বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে সম্পূর্ণ ছিলেন। মাতৃভাষার মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার সেই আন্দোলন তাঁর চিন্তা, চেতনা ও জীবনদর্শনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ও জাতীয় পর্যায়ের স্মরণ-আয়োজনে তাঁর অবদান এখনো যথাযথ গুরুত্বে উপস্থাপিত হয়নি।

​বদ্রুজ্জামান শুধু ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত একজন কর্মীই ছিলেন না; তিনি ছিলেন জ্ঞানমনস্ক, সমাজসচেতন ও বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী একজন মানুষ। সংবাদপত্র ও সাময়িকী সাহিত্য পাঠের প্রতি তাঁর ছিল গভীর আগ্রহ। তিনি সাপ্তাহিক সৈনিক, নও বেলাল ও যুগের দাবী পত্রিকায় মাঝে মধ্যে লিখতেন। নিয়মিতভাবে পত্রিকার সম্পাদকীয় ও উপসম্পাদকীয় মনোযোগ দিয়ে পড়তেন। পাশাপাশি বিভিন্ন ফিচারও আগ্রহসহকারে পাঠ করতেন। সমকালীন সমাজ, রাষ্ট্র, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় বিষয় সম্পর্কে তাঁর চিন্তাশীলতার পেছনে এই পাঠ অভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল বলে ধারণা করা যায়।
​কুসংস্কার বিষয়ে তিনি বিশেষভাবে সতর্ক ছিলেন। ধর্মীয় বিশ্বাস ও সামাজিক জীবনে অন্ধতা ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা করার চেষ্টা করতেন। তাঁর জীবনাচরণে ধর্মীয় মূল্যবোধ, বজায় রাখার বিষয়ে তিনি মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা করতেন।
​সামাজিক দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার সমন্বয় লক্ষ্য করা যায়।
​বদরুজ্জামানের জীবন কেবল ভাষা আন্দোলনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন একজন শিক্ষানুরাগী ও সমাজহিতৈষী। শিক্ষা বিস্তারের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে তিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা ও শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। একটি সমাজকে এগিয়ে নিতে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই—এই উপলব্ধি থেকেই তিনি প্রজন্মের পর প্রজন্মকে আলোকিত করার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন।
​ধর্মীয় ও সামাজিক অবকাঠামো গড়ার ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। মাদ্রাসা, মসজিদ ও ঈদগাহ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে তিনি সম্পূর্ণ ছিলেন। এসব উদ্যোগ শুধু ইবাদতের স্থান নির্মাণ নয়; বরং স্থানীয় মানুষের সামাজিক ও নৈতিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করারও একটি প্রয়াস ছিল।
​১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তাঁর মানবিক ও সামাজিক দায়িত্ববোধের পরিচয় পাওয়া যায়। যুদ্ধকালীন সংকটময় পরিস্থিতিতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের ইজ্জত-সম্মান ও সম্পদ রক্ষায় তিনি বিশেষ ভূমিকা পালন করেন বলে স্থানীয়ভাবে স্মৃতিচারণ ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়। তাঁর বাবার বাংলায় লঙ্গরখানা খুলে তিনি বিপদগ্রস্ত সংখ্যালঘু মানুষদের খাবারের ব্যবস্থা করেছিলেন। যুদ্ধের ভয়াবহ সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এই উদ্যোগ তাঁর মানবিকতা, সাহস ও অসাম্প্রদায়িক সামাজিক চেতনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
​বদরুজ্জামানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় ছিল ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে। খেলাধুলাকে তিনি শুধু বিনোদন হিসেবে দেখেননি; তরুণ সমাজকে সুস্থ, শৃঙ্খলাপরায়ণ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার অন্যতম মাধ্যম হিসেবে দেখেছেন। ফুটবলের সঙ্গে তাঁর ছিল গভীর সম্পৃক্ততা। তিনি ফুটবল রেফারি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বিভাগীয় পর্যায়সহ উচ্চতর পর্যায়ের খেলায় রেফারির দায়িত্ব পালনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর এই বহুমুখী কর্মজীবন প্রমাণ করে যে তিনি সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রের উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন।
​সমাজে শান্তি, সম্প্রীতি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও বদরুজ্জামানের ভূমিকা স্মরণযোগ্য। স্থানীয় মানুষের বিভিন্ন বিরোধ ও সমস্যার সমাধানে তিনি শালিশ-বৈঠকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। মানুষের কথা শুনে, উভয় পক্ষের বক্তব্য বিবেচনা করে ন্যায়সঙ্গত সমাধানের চেষ্টা করতেন। ফলে সমাজে তিনি একজন গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে মানুষের আস্থা অর্জন করেছিলেন।
​একজন মানুষ একই সঙ্গে ভাষা আন্দোলনের কর্মী, শিক্ষানুরাগী, সমাজসংগঠক, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার উদ্যোক্তা, ক্রীড়া সংগঠক, ফুটবল রেফারি, লেখক ও পাঠক এবং সামাজিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে নেতৃত্বদানকারী—এমন বহুমুখী জীবন নিশ্চিতভাবে আমাদের জাতীয় ইতিহাস ও সমাজের জন্য মূল্যবান সম্পদ। তাঁকে অনেক বিশ্লেষণে বিশেষায়িত করা যায়। একজন সামাজিক উদ্যোক্তা হিসেবে তাঁর সৃষ্টিশীল কাজের জন্য তিনি সমাজের মানুষের কাছে দীর্ঘকাল স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে থাকার যোগ্য।
​কিন্তু প্রশ্ন হলো—ভাষাসৈনিক বদরুজ্জামানের মতো একজন বহুমুখী ব্যক্তিত্বকে আমরা জাতীয়ভাবে কতটা স্মরণ করছি?
​শুধু কোনো বিশেষ দিবসে তাঁর নাম উচ্চারণ করাই যথেষ্ট নয়। তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। ভাষা আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা কী ছিল, সে সময়কার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা কী ছিল, তাঁর চিন্তা-চেতনা কী ছিল, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর ভূমিকা কী ছিল, ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ সম্পর্কে শিক্ষক ও সামাজিক উন্নয়নে তাঁর অবদান কতটা বিস্তৃত ছিল, ক্রীড়া ও সামাজিক নেতৃত্বে তাঁর ভূমিকা কী ছিল—এসব বিষয় নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন।
​বাংলাদেশের জাতীয় সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব শুধু সুপরিচিত ব্যক্তিদেরই স্মরণ করা নয়; বরং ইতিহাসের আড়ালে থাকা ভাষাসৈনিক, সমাজসংগঠক ও স্থানীয় পর্যায়ের কীর্তিমান মানুষদের অবদানও অনুসন্ধান, সংরক্ষণ ও জাতীয়ভাবে তুলে ধরা।
​বদরুজ্জামানকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন ব্যক্তিকে স্মরণ করা নয়; বরং ভাষা আন্দোলনের সেই অজানা-অল্পপরিচিত ইতিহাসকে সম্মান করা, যে ইতিহাসের ওপর দাঁড়িয়ে আমাদের বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর জীবনদর্শন, মানবিক কর্মকাণ্ড, শিক্ষা বিস্তার, সামাজিক নেতৃত্ব, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক চিন্তাশীল অবদানকে সংরক্ষণ করা জরুরি।
​আজ প্রয়োজন তাঁর জীবন ও কর্মের নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ, দলিল-দস্তাবেজ সংরক্ষণ, গবেষণা ও প্রকাশনা। জাতীয় পর্যায়ে তাঁর স্মরণে আলোচনা সভা, স্মারকগ্রন্থ প্রকাশনার উদ্যোগ-সহ গবেষণামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা যেতে পারে।
​কিংবা গবেষণামূলক অনুষ্ঠান আয়োজন করা যেতে পারে। একই সঙ্গে তাঁর প্রতিষ্ঠিত বা সংশ্লিষ্ট শিক্ষা, ধর্মীয় ও ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর ইতিহাসও সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।
​ভাষাসৈনিক বদরুজ্জামানের অবদান যেন বিস্মৃতির আড়ালে হারিয়ে না যায়—এটাই আজকের প্রত্যাশা। তাঁর জীবন ও কর্ম নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা হোক, জাতীয় ইতিহাসে তাঁর যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করা হোক।

​লেখক: ড. মো. আবু তাহের
গবেষক, আইনজীবী ও সাংবাদিক।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

​ভাষাসৈনিক বদরুজ্জামান ও আমাদের দায়িত্ব। ​– ড. মো. আবু তাহের

​ভাষাসৈনিক বদরুজ্জামান ও আমাদের দায়িত্ব। ​– ড. মো. আবু তাহের

Update Time : ১৩ ঘন্টা আগে

ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; ভাষা একটি জাতির আত্মপরিচয়, অস্তিত্ব ও অধিকারবোধের প্রতীক। বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে যে অসংখ্য মানুষ জীবন, শ্রম ও সাহস দিয়ে ভূমিকা রেখেছেন, তাঁদের অনেকের অবদান আজও জাতীয় ইতিহাসে যথাযথভাবে স্থান পায়নি। তাঁদেরই একজন ভাষাসৈনিক বদরুজ্জামান। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দের ১লা মার্চে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মিরপুর গ্রামে। ভাষা আন্দোলনের উত্তাল সময়ে বদরুজ্জামান বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে সম্পূর্ণ ছিলেন। মাতৃভাষার মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার সেই আন্দোলন তাঁর চিন্তা, চেতনা ও জীবনদর্শনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ও জাতীয় পর্যায়ের স্মরণ-আয়োজনে তাঁর অবদান এখনো যথাযথ গুরুত্বে উপস্থাপিত হয়নি।

​বদ্রুজ্জামান শুধু ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত একজন কর্মীই ছিলেন না; তিনি ছিলেন জ্ঞানমনস্ক, সমাজসচেতন ও বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী একজন মানুষ। সংবাদপত্র ও সাময়িকী সাহিত্য পাঠের প্রতি তাঁর ছিল গভীর আগ্রহ। তিনি সাপ্তাহিক সৈনিক, নও বেলাল ও যুগের দাবী পত্রিকায় মাঝে মধ্যে লিখতেন। নিয়মিতভাবে পত্রিকার সম্পাদকীয় ও উপসম্পাদকীয় মনোযোগ দিয়ে পড়তেন। পাশাপাশি বিভিন্ন ফিচারও আগ্রহসহকারে পাঠ করতেন। সমকালীন সমাজ, রাষ্ট্র, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় বিষয় সম্পর্কে তাঁর চিন্তাশীলতার পেছনে এই পাঠ অভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল বলে ধারণা করা যায়।
​কুসংস্কার বিষয়ে তিনি বিশেষভাবে সতর্ক ছিলেন। ধর্মীয় বিশ্বাস ও সামাজিক জীবনে অন্ধতা ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা করার চেষ্টা করতেন। তাঁর জীবনাচরণে ধর্মীয় মূল্যবোধ, বজায় রাখার বিষয়ে তিনি মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা করতেন।
​সামাজিক দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার সমন্বয় লক্ষ্য করা যায়।
​বদরুজ্জামানের জীবন কেবল ভাষা আন্দোলনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন একজন শিক্ষানুরাগী ও সমাজহিতৈষী। শিক্ষা বিস্তারের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে তিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা ও শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। একটি সমাজকে এগিয়ে নিতে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই—এই উপলব্ধি থেকেই তিনি প্রজন্মের পর প্রজন্মকে আলোকিত করার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন।
​ধর্মীয় ও সামাজিক অবকাঠামো গড়ার ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। মাদ্রাসা, মসজিদ ও ঈদগাহ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে তিনি সম্পূর্ণ ছিলেন। এসব উদ্যোগ শুধু ইবাদতের স্থান নির্মাণ নয়; বরং স্থানীয় মানুষের সামাজিক ও নৈতিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করারও একটি প্রয়াস ছিল।
​১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তাঁর মানবিক ও সামাজিক দায়িত্ববোধের পরিচয় পাওয়া যায়। যুদ্ধকালীন সংকটময় পরিস্থিতিতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের ইজ্জত-সম্মান ও সম্পদ রক্ষায় তিনি বিশেষ ভূমিকা পালন করেন বলে স্থানীয়ভাবে স্মৃতিচারণ ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়। তাঁর বাবার বাংলায় লঙ্গরখানা খুলে তিনি বিপদগ্রস্ত সংখ্যালঘু মানুষদের খাবারের ব্যবস্থা করেছিলেন। যুদ্ধের ভয়াবহ সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এই উদ্যোগ তাঁর মানবিকতা, সাহস ও অসাম্প্রদায়িক সামাজিক চেতনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
​বদরুজ্জামানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় ছিল ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে। খেলাধুলাকে তিনি শুধু বিনোদন হিসেবে দেখেননি; তরুণ সমাজকে সুস্থ, শৃঙ্খলাপরায়ণ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার অন্যতম মাধ্যম হিসেবে দেখেছেন। ফুটবলের সঙ্গে তাঁর ছিল গভীর সম্পৃক্ততা। তিনি ফুটবল রেফারি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বিভাগীয় পর্যায়সহ উচ্চতর পর্যায়ের খেলায় রেফারির দায়িত্ব পালনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর এই বহুমুখী কর্মজীবন প্রমাণ করে যে তিনি সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রের উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন।
​সমাজে শান্তি, সম্প্রীতি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও বদরুজ্জামানের ভূমিকা স্মরণযোগ্য। স্থানীয় মানুষের বিভিন্ন বিরোধ ও সমস্যার সমাধানে তিনি শালিশ-বৈঠকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। মানুষের কথা শুনে, উভয় পক্ষের বক্তব্য বিবেচনা করে ন্যায়সঙ্গত সমাধানের চেষ্টা করতেন। ফলে সমাজে তিনি একজন গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে মানুষের আস্থা অর্জন করেছিলেন।
​একজন মানুষ একই সঙ্গে ভাষা আন্দোলনের কর্মী, শিক্ষানুরাগী, সমাজসংগঠক, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার উদ্যোক্তা, ক্রীড়া সংগঠক, ফুটবল রেফারি, লেখক ও পাঠক এবং সামাজিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে নেতৃত্বদানকারী—এমন বহুমুখী জীবন নিশ্চিতভাবে আমাদের জাতীয় ইতিহাস ও সমাজের জন্য মূল্যবান সম্পদ। তাঁকে অনেক বিশ্লেষণে বিশেষায়িত করা যায়। একজন সামাজিক উদ্যোক্তা হিসেবে তাঁর সৃষ্টিশীল কাজের জন্য তিনি সমাজের মানুষের কাছে দীর্ঘকাল স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে থাকার যোগ্য।
​কিন্তু প্রশ্ন হলো—ভাষাসৈনিক বদরুজ্জামানের মতো একজন বহুমুখী ব্যক্তিত্বকে আমরা জাতীয়ভাবে কতটা স্মরণ করছি?
​শুধু কোনো বিশেষ দিবসে তাঁর নাম উচ্চারণ করাই যথেষ্ট নয়। তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। ভাষা আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা কী ছিল, সে সময়কার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা কী ছিল, তাঁর চিন্তা-চেতনা কী ছিল, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর ভূমিকা কী ছিল, ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ সম্পর্কে শিক্ষক ও সামাজিক উন্নয়নে তাঁর অবদান কতটা বিস্তৃত ছিল, ক্রীড়া ও সামাজিক নেতৃত্বে তাঁর ভূমিকা কী ছিল—এসব বিষয় নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন।
​বাংলাদেশের জাতীয় সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব শুধু সুপরিচিত ব্যক্তিদেরই স্মরণ করা নয়; বরং ইতিহাসের আড়ালে থাকা ভাষাসৈনিক, সমাজসংগঠক ও স্থানীয় পর্যায়ের কীর্তিমান মানুষদের অবদানও অনুসন্ধান, সংরক্ষণ ও জাতীয়ভাবে তুলে ধরা।
​বদরুজ্জামানকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন ব্যক্তিকে স্মরণ করা নয়; বরং ভাষা আন্দোলনের সেই অজানা-অল্পপরিচিত ইতিহাসকে সম্মান করা, যে ইতিহাসের ওপর দাঁড়িয়ে আমাদের বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর জীবনদর্শন, মানবিক কর্মকাণ্ড, শিক্ষা বিস্তার, সামাজিক নেতৃত্ব, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক চিন্তাশীল অবদানকে সংরক্ষণ করা জরুরি।
​আজ প্রয়োজন তাঁর জীবন ও কর্মের নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ, দলিল-দস্তাবেজ সংরক্ষণ, গবেষণা ও প্রকাশনা। জাতীয় পর্যায়ে তাঁর স্মরণে আলোচনা সভা, স্মারকগ্রন্থ প্রকাশনার উদ্যোগ-সহ গবেষণামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা যেতে পারে।
​কিংবা গবেষণামূলক অনুষ্ঠান আয়োজন করা যেতে পারে। একই সঙ্গে তাঁর প্রতিষ্ঠিত বা সংশ্লিষ্ট শিক্ষা, ধর্মীয় ও ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর ইতিহাসও সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।
​ভাষাসৈনিক বদরুজ্জামানের অবদান যেন বিস্মৃতির আড়ালে হারিয়ে না যায়—এটাই আজকের প্রত্যাশা। তাঁর জীবন ও কর্ম নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা হোক, জাতীয় ইতিহাসে তাঁর যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করা হোক।

​লেখক: ড. মো. আবু তাহের
গবেষক, আইনজীবী ও সাংবাদিক।