
আমাদের সমাজ ব্যবস্থা ও দৈনন্দিন জীবনে সোস্যাল মিডিয়া ও ফেইসবুক এখন এক অভিচ্ছেধ্য অংশ।
এক সময়ে দেশ ও দশের খবরা খবর জানার জন্য রেডিও টেলিভিশন ও পএ পএিকার উপরই আমাদের নির্ভর থাকতে হতো।কিন্তু বর্তমান তথ্য প্রযুক্তির এইযুগে সব প্রচার মাধ্যমকে পিছনে ফেলে সোস্যাল মিডিয়াই স্থান করে নিয়েছে মানুষের অন্তরের অন্তরস্থলে।যে কোন ঘটনা ঘটার সাথে সাথেই সোস্যাল মিডিয়ার কল্যাণে চোখের সামনে ভেসে উঠে নিউজের শিরোনাম হিসাবে। বাস্তবতার নিরিখে অনেক ঘটনার সত্যতা থাকলেও বেশিরভাগ খবর মিথ্যার আবরনে ঢাকা থাকে।
ব্যক্তিগত মতবিরোধ, দলীয় মতবিরোধ ও পারিবারিক শত্রুুতার জের ধরে এ আই ব্যবহার করে মিথ্যা, বানোয়াট, কুৎসিত ও উদ্যেশ্য প্রনোদিত সংবাদ প্রচার করা হয় বিভিন্ন ফেক আইডি খুলে।হাজারো অপপ্রচার এর মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে জীবিত মানুষকে মৃত বলে অপপ্রচার করা যেনো একটি মহলের রুটিন মাফিক কাজ হয়ে গেছে। জীবিত মানুষকে মৃত বলে অপপ্রচার করার কারণে সেই ব্যক্তির পরিবার পরিজন সহ হিতাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে যে ছিতম তৈরি হয় তার দায়ভারটা কতো কঠিন ও কঠোর তা আমরা অনেকেই না বুঝে এই মিথ্যা অপপ্রচার করে যাচ্ছি। আসুন জীবিত মানুষকে মৃত বলে অপপ্রচার করলে ইসলাম কি বলে তা সংক্ষিপ্ত ভাবে যেনে নেই।
ইসলামের দৃষ্টিতে কোনো জীবিত মানুষকে মৃত বলে অপপ্রচার করা একটি কবিরা গুনাহ (মহাপাপ), মারাত্মক জুলুম এবং সামাজিক ফিতনা তৈরির শামিল। ইসলামে মিথ্যা কথা বলা, মিথ্যা তথ্য ছড়ানো এবং অন্যের ক্ষতি করা সম্পূর্ণ হারাম বা নিষিদ্ধ।
জীবিত ব্যক্তিকে মৃত বলে অপপ্রচার করার অপরাধের গভীরতা এবং এর ইসলামী বিধান নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. মিথ্যা ও অপবাদের অপরাধ
ইসলামে যাচাই-বাছাই না করে যেকোনো তথ্য ছড়ানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
"হে মুমিনগণ! যদি কোনো পাপাচারী ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো বার্তা নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই করে নাও, যাতে অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি না করে বসো এবং পরে তোমাদের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হতে না হয়।" (সূরা হুজুরাত, আয়াত: ৬)
কোনো জীবিত ব্যক্তিকে মৃত বলে প্রচার করা স্পষ্ট মিথ্যাচার। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার ওপর মিথ্যা আরোপ করবে, সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা বানিয়ে নেয়।" (বুখারী)। একইভাবে সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রেও মিথ্যা রটানো এবং তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা অন্য কোথাও ছড়িয়ে দেওয়া কঠিন গুনাহের কাজ।
২. মানবাধিকার বা বান্দার হক লঙ্ঘন
কাউকে জীবিত থাকা সত্ত্বেও মৃত বলে অপপ্রচার করলে তার পরিবার, আত্মীয়-স্বজন এবং শুভাকাঙ্ক্ষীরা চরম মানসিক কষ্টের শিকার হন। এতে ওই ব্যক্তির সামাজিক ও পেশাগত ক্ষেত্রেও অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে। ইসলামে একে 'জুলুম' বলা হয়েছে। এটি সরাসরি 'বান্দার হক' বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অন্তর্ভুক্ত, যা সংশ্লিষ্ট ভুক্তভোগী ব্যক্তি ক্ষমা না করলে আল্লাহ তাআলা ক্ষমা করবেন না।
৩. ফিতনা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি
মিথ্যা গুজব ছড়িয়ে সমাজে আতঙ্ক, বিভ্রান্তি বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করাকে ইসলামে কঠোরভাবে নিন্দা করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, "ফিতনা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হত্যাকাণ্ড অপেক্ষাও গুরুতর অপরাধ।" (সূরা বাকারাহ, আয়াত: ১৯১)।
ইসলামের দৃষ্টিতে এর শাস্তি
ইসলামী শরিয়তে অপরাধের শাস্তিকে সাধারণত কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়। জীবিত মানুষকে মৃত বানানোর অপপ্রচারের ক্ষেত্রে শাস্তির বিধান নিচে দেওয়া হলো:
• দুনিয়াতে শিক্ষামূলক শাস্তি (তা'যীর): শরিয়তের পরিভাষায় যে সব অপরাধের নির্দিষ্ট শাস্তি (হদ) কুরআনে উল্লেখ নেই, সেগুলোর ক্ষেত্রে রাষ্ট্র বা বিচারক অপরাধের তীব্রতা বুঝে যেকোনো শাস্তি নির্ধারণ করতে পারেন, একে 'তা'যীর' বলা হয়। জীবিত মানুষকে মৃত বানানোর অপপ্রচারকারীদের বিচারক বা রাষ্ট্র আর্থিক জরিমানা, কারাদণ্ড, বা সামাজিক কোনো কঠোর শাস্তি দিতে পারেন, যাতে সমাজে এমন অপরাধের পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
• আখিরাতের শাস্তি ও অভিশাপ: এই ধরনের মিথ্যা ও অপপ্রচারের জন্য দুনিয়াতে তওবা ও ভুক্তভোগীর কাছ থেকে ক্ষমা না চেয়ে নিলে আখিরাতে কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, "নিশ্চয় যারা মিথ্যা অপবাদ রটায়, তারা দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশপ্ত এবং তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।" (সূরা নূর, আয়াত: ২৩)।
• নেক আমল বাতিল হওয়া: কিয়ামতের দিন এই অপপ্রচারকারীকে তার সৎ আমলগুলো (নামাজ, রোজা ইত্যাদি) ভুক্তভোগী ব্যক্তিকে দিয়ে দিতে হবে। এতেও যদি ক্ষতিপূরণ না হয়, তবে ভুক্তভোগীর পাপের বোঝা অপপ্রচারকারীর ঘাড়ে চাপানো হবে এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে (মুসলিম)।
করণীয়: না জেনে বা হুজুগে পড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোনো মৃত্যুর খবর শেয়ার করা থেকে বিরত থাকা উচিত। কোনো খবর সামনে এলে তা বিশ্বস্ত সূত্র থেকে শতভাগ নিশ্চিত না হয়ে ছড়ানো মোটেও জায়েজ নয়।
লেখক পরিচিতি।
এম আতিকুর রহমান আখই
সিনিয়র সাংবাদিক ও কলাম লেখক।
সম্পাদক ও প্রকাশক: শেখ সাইফুল ইসলাম সিদ্দিকী, মোবাইলঃ 01712-823054
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।