
দেশের সর্ববৃহৎ হাওর হাকালুকিতে প্রকৃতি যেন এক নিষ্ঠুর খেলায় মেতেছে। একদিকে পাহাড়ি ঢল আর অকাল বন্যা, অন্যদিকে অবিরত অনাবৃষ্টি ও ঝড়—সব মিলিয়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে হাজারো কৃষকের আজন্মলালিত স্বপ্ন। উত্তর দিকে ফেঞ্চুগঞ্জ, দক্ষিণ-পশ্চিমে কুলাউড়া এবং পূর্ব দিকে জুরী ও বড়লেখা উপজেলা জুড়ে বিস্তৃত এই বিশাল হাওরাঞ্চল এখন এক শোকের জনপদে পরিণত হয়েছে।
**বস্তাবন্দি ধানেও জুটল না কৃষকের ভাগ্যে**
এবারের বন্যায় সবচেয়ে হৃদয়বিদারক চিত্র দেখা গেছে হাকালুকির পাড়ে। অনেক কৃষক বন্যার পূর্বাভাস পেয়ে তড়িঘড়ি করে মাঠের ধান কেটে বস্তাবন্দি করে রেখেছিলেন। কিন্তু সেই ধান আর ঘরে তোলা সম্ভব হয়নি। কৃষকদের অভিযোগ, হাওরের অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোর বেহাল দশা, যত্রতত্র গর্ত আর হাঁটু সমান কাদার কারণে কোনো যানবাহন জমিনের পাশে পৌঁছাতে পারেনি। ফলে বস্তাবন্দি পাকা ধান মাঠের ধারেই পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
কুলাউড়া ও জুরী এলাকার কৃষকরা আর্তনাদ করে বলেন, "নিজেদের জান দিয়ে ধান কাটলাম, বস্তায় ভরলাম। কিন্তু রাস্তার ভাঙন আর কাদার জন্য সেই ধান আনতে পারলাম না। চোখের সামনেই বস্তাগুলো পানির নিচে চলে গেল।"
**চর্তুমুখী সংকটে দিশেহারা জনপদ**
সরেজমিনে দেখা গেছে, হাকালুকি তীরের গ্রামগুলোতে মানুষের হাহাকার থামছেই না। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এত দ্রুত এসেছে যে, অনেক কৃষক ফসল রক্ষা করার ন্যূনতম সময়টুকুও পাননি।

১. **আর্থিক বিপর্যয়:** অনেকেই এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে বা ধার-দেনা করে চাষাবাদ করেছিলেন। এখন ফসল ও পুঁজি দুটোই হারিয়ে তারা দেনার দায়ে দিশেহারা।
২. **গো-খাদ্যের তীব্র সংকট:** ধান তলিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি পচে গেছে খড়। ফলে গবাদি পশু নিয়ে খামারিরা চরম বিপাকে পড়েছেন।
৩. **প্রকৃতির বৈরিতা:** একদিকে টানা অনাবৃষ্টিতে ধান পুষ্ট হতে বাধা পেয়েছে, তার ওপর হঠাৎ আসা ঝড় ও ঢল কৃষকের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে।
**স্থায়ী সমাধানের দাবি**
হাকালুকি পাড়ের ভুক্তভোগী মানুষের দাবি, প্রতি বছর অকাল বন্যায় এভাবে নিঃস্ব হওয়ার হাত থেকে বাঁচতে টেকসই বাঁধ এবং হাওরের ভেতরের কৃষি রাস্তাগুলো জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার করা প্রয়োজন। যাতায়াত ব্যবস্থা উন্নত থাকলে অন্তত কাটা ধানটুকু ঘরে তোলা সম্ভব হতো বলে মনে করেন স্থানীয়রা।
হাকালুকির জলরাশির ওপর এখন কেবল কৃষকের কান্নার প্রতিধ্বনি। যে সোনালী ধান গোলায় ওঠার কথা ছিল, তা এখন পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে হাওরের পানিতে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: শেখ সাইফুল ইসলাম সিদ্দিকী, মোবাইলঃ 01712-823054
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।