
জাসিমুল ইসলাম ইউনাইটেড আরব আমিরাত:
একসময় আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সিলেটকে বলা হতো বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ। কারণ, সিলেট শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের নয়, বরং বুদ্ধিবৃত্তিক, অর্থনৈতিক, প্রবাসী অবদান এবং মুক্তিযুদ্ধেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
দেশের অর্থনীতির একটি বড় অংশ গড়ে উঠেছে প্রবাসী সিলেটিদের রেমিট্যান্সের ওপর। অথচ আজ সেই সিলেট ক্রমেই অবহেলার অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে। এই মাটিতে জন্ম নিয়েছেন অসংখ্য প্রজ্ঞাবান ও দূরদর্শী রাজনীতিবিদ, যাদের নেতৃত্বে বাংলাদেশের নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
সিলেট ছিল দেশের নেতৃত্বের মূলধারা গঠনে অন্যতম অবদানকারী অঞ্চল। এই অঞ্চলের বেশ কয়েকজন রাজনীতিক জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। আবুল মাল আবদুল মুহিত সাবেক অর্থমন্ত্রী হিসেবে দেশের বাজেট ব্যবস্থাপনায় নতুন দিগন্ত সৃষ্টি করেন। ড. এ কে আব্দুল মোমেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে বিশ্ব কূটনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান শক্ত করেন। এম এ মান্নান পরিকল্পনামন্ত্রী হিসেবে সিলেটসহ দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে ভূমিকা রাখেন। নুরুল ইসলাম নাহিদ শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে জাতীয় শিক্ষানীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ইমরান আহমদ প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী হিসেবে প্রবাসী সিলেটিদের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করেছেন।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সিলেটবাসী অসাধারণ সাহস ও ত্যাগের পরিচয় দিয়েছে। সীমান্তবর্তী অঞ্চল হওয়ায় সিলেটের মানুষ ভারতে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে গেরিলা ও শহর মুক্তি অভিযানে অংশ নেয়। উল্লেখযোগ্য মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ছিলেন বঙ্গবীর জেনারেল এম. এ. জি. উসমানী, মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক; বীর উত্তম লে. কর্নেল আবু তাহের; বীর বিক্রম মাহবুব আলী; বীর প্রতীক সুবেদার নাসির উদ্দিন। এছাড়া স্থানীয় শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ছিলেন শহীদ আলী আহমদ ও শহীদ শামছুল হক প্রমুখ। তাদের সাহসিকতা ও ত্যাগ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে।

একসময় সরকারের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা সিলেট আজ যেন রাজনীতির প্রান্তিক অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর থেকেই সিলেটের প্রতি অবজ্ঞা ও উপেক্ষার অভিযোগ উঠেছে। ইউনুস সাহেব ও তার উপদেষ্টা পরিষদে সিলেট থেকে কোনো প্রতিনিধি না থাকা বিষয়টি সিলেটবাসীর মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে—এই ঐতিহ্যবাহী, শিক্ষিত, দেশপ্রেমিক অঞ্চলে কি একজনও যোগ্য ব্যক্তি ছিলেন না, যিনি উপদেষ্টা পদে দায়িত্ব নিতে পারতেন? না কি সিলেটের অবদান এখন আর কারো চোখে পড়ে না? সরকার পরিবর্তনের ১৪ মাস পার হলেও ইউনুস সাহেব কিংবা তার উপদেষ্টা পরিষদের কেউ একবারও সিলেট সফরের প্রয়োজন মনে করেননি। যে সিলেট একসময় রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের প্রতীক ছিল, আজ সেটাই যেন রাজনৈতিকভাবে পরিত্যক্ত অঞ্চল।
সিলেটের প্রতি এই নীরব উপেক্ষা শুধু রাজনৈতিক নয়, এটি এক প্রকার অপমানও বটে। এটি একটি অঞ্চলের মর্যাদাকে ছোট করে দেখার চরম উদাহরণ, যা দেশের ঐক্য ও ভারসাম্যের জন্য শুভ নয়। সিলেটের অবদান শুধু রাজনীতিতে নয়—বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, অর্থনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও প্রবাসী শক্তির প্রতিটি ক্ষেত্রে সিলেটবাসীর রক্ত-মিশ্রিত শ্রম রয়েছে। এই অবদান উপেক্ষা করা মানে জাতীয় ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে মুছে ফেলা।
সময় থাকতে সিলেটবাসীকে নিজের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। না হলে আগামী দিনে এই অঞ্চলের ভাগ্যে আরও গভীর অবহেলা, বঞ্চনা ও অপমান লেখা থাকবে।

Reporter Name 















